যাকাতের খাত কয়টি ?

যাকাতের খাত কয়টি
যাকাতের খাত কয়টি

যাকাতের খাত কয়টি ?

যাকাতের খাত কয়টি ? তা নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো :

আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে যাকাতের অর্থব্যয়ের খাতসমূহ উল্লেখ করে দিয়েছেন। কুরআনে যাকাতের অর্থ ব্যয়ের জন্য যাকাতের খাত কয়টি তা উল্লেখিত হয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয়ই সাদাকা (যাকাত) হচ্ছে ফকির ও মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; (যা বন্টন করা যায়) দাস আজাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্থদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাবিদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।” (তওবা : ৯/৬০)

উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যাকাত প্রদানের আটটি খাতের কথা উল্লেখ করেছেন। নিচে যাকাতের খাত কয়টির প্রত্যেকটি খাত আলাদা করে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

১. ফকির : নিঃসম্বল ভিক্ষা প্রার্থী। যাকে আল্লাহ তা’আলা যাকাতের আটটি খাতের প্রথমেই উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিনিয়ত দারিদ্র্য থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি বলতেন- ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট কুফরি ও দারিদ্র থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।’ (আবু দাউদ : ৫০৯০)। অতএব, ফকির যাকাতের মাল পাওয়ার হকদার।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরা যদি প্রকাশ্য সাদাকা প্রদান কর তবে উহা ভালো; আর যদি তা গোপনে করো এবং দরিদ্রদেরকে দাও তা তোমাদের জন্য আরো ভালো।” (সূরা বাকারা : ২৭১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন- ‘আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর তাদের সম্পদে সাদাকা (যাকাত) ফরজ করেছেন। যেটা তাদের ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে এবং তাদের দরিদ্রের মাঝে বণ্টন হবে।’ (বুখারী : ১৩৯৫)

২. মিসকিন : যাকাত প্রদানের আটটি খাতের মধ্যে দ্বিতীয় যাকাতের খাত হিসেবে আল্লাহ তা’আলা মিসকিন কে উল্লেখ করেছেন। আর মিসকিন হল ওই ব্যক্তি যে নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারেনা, মুখ ফুটে চাইতেও পারে না। বাহ্যিকভাবে তাকে সচ্ছল বলেই মনে হয়। হাদিসে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এমন ব্যক্তি মিসকিন নয় যে এক মুঠো-দু’মুঠো খাবারের জন্য বা দুই একটি খেজুরের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় এবং তাকে তা দেওয়া হলে ফিরে আসে। বরং প্রকৃত মিসকিন হল সেই ব্যক্তি, যার প্রয়োজন পূরণ করার মত যথেষ্ট সঙ্গতি নেই। অথচ তাকে চেনাও যায় না যাতে লোকে তাকে সদাকা করতে পারে এবং সে নিজেও মানুষের নিকট কিছু চায়না।

৩. যাকাত আদায়কারী ও হেফাজতকারী :

আল্লাহ তা’আলা যাকাত প্রদানের তৃতীয় খাত হিসেবে ওই ব্যক্তিকে উল্লেখ করেছেন, যে ব্যক্তি যাকাত আদায়, হেফাজত ও বন্টনের কাজে নিয়োজিত। অতএব উক্ত ব্যক্তি সম্পদশালী হলেও সে চাইলে যাকাতের অংশ গ্রহণ করতে পারবে।

হাদিসে এসেছে, ইবনে সায়ে’দী আল-মালেকী (রাঃ) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা:) আমাকে যাকাত আদায়কারী হিসেবে নিযুক্ত করলেন। যখন আমি কাজ শেষ করলাম এবং তার কাছে পৌঁছে দিলাম তখন তিনি নির্দেশ দিলেন আমাকে পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য। আমি বললাম, আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আমি করেছি। সুতরাং আমি আল্লাহর নিকট থেকে এর প্রতিদান নেব। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সময় যাকাত আদায়কারীর কাজ করেছি। তখন তিনিও আমাকে পারিশ্রমিক প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন আমিও তোমার মতই এরূপ কথা বলেছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছিলেন, যখন তুমি না চাওয়া সত্ত্বেও তোমাকে কিছু দেওয়া হয়, তখন তুমি তা গ্রহণ করো। তুমি তা নিজে খাও অথবা সাদাকা করো। ( মুসলিম : ১০৪৫)

অন্য হাদিসে এসেছে, আতা ইবনু ইয়াসার রাদিয়াল্লাহ হতে বর্ণিত; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন, সম্পদশালী ব্যক্তির জন্য যাকাত গ্রহণ হালাল নয়। তবে পাঁচ শ্রেণীর ধনীর জন্য তা জায়েজ।

(১). আল্লাহর পথে জিহাদরত ব্যাক্তি। (২). যাকাত আদায়ের নিয়োজিত কর্মচারী। (৩). ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। (৪). যে ব্যক্তি যাকাতের মাল নিজ মাল দ্বারা ক্রয় করেছে। (৫). মিসকিন প্রতিবেশী তার প্রাপ্ত যাকাত থেকে ধনী ব্যক্তিকে উপঢৌকন দিয়েছে। (আবু দাউদ : ১৬৩৫)

৪. ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য কোন অমুসলিমকে যাকাত প্রদান করা : ইসলামে প্রতি আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে অথবা কোন অনিষ্ট বা কাফেরের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার লক্ষে কোন অমুসলিমকে যাকাতের খাত থেকে অর্থ প্রদান করা যায়।

৫. দাস মুক্তির জন্যে : যারা লিখিত কোন চুক্তির বিনিময়ে দাসে পরিণত হয়েছে। তাদেরকে মালিকের নিকট থেকে ক্রয়ের মাধ্যমে মুক্ত করার লক্ষ্যে যাকাতের খাত থেকে অর্থ প্রদান করা যায়। অনুরূপভাবে বর্তমানে কোন মুসলিম ব্যক্তি অমুসলিমের হাতে বন্দি হলে সে ব্যক্তি ও যাকাতের খাতের অন্তর্ভুক্ত হবে।

হাদিসে এসেছে, বারা ইবনু আযেব (রা:) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে বলল, আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যা আমাকে জান্নাতের নিকটবর্তী করাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে। রাসূল (সাঃ) বললেন, প্রশ্ন তো তুমি অল্প কথায় বলে ফেললে; কিন্তু তুমি অত্যন্ত ব্যাপক বিষয় জানতে চেয়েছ। তুমি একটি প্রাণী আজাদ করে দাও এবং একটি দাস মুক্ত করে দাও। লোকটি বলল, এই উভয়টি কি একই কাজ নয় ? তিনি বললেন, না। (উভয়টি এক নয়) কেননা, একটি প্রাণী আজাদ করার মানে হল- তুমি একাকি গোটা প্রাণীকে মুক্ত করে দিবে।

আর একটি দাস মুক্ত করা অর্থ হলো- তার মুক্তির জন্য কিছু মূল্য প্রদানের মাধ্যমে সাহায্য করবে। জান্নাতে প্রবেশকারী কাজের মধ্যে অন্যতম হলো- প্রচুর দুধ প্রদানকারী জানোয়ার দান করা এবং এমন নিকটতম আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ করা; যে তোমার উপর অত্যাচারী। যদি তুমি এই সমস্ত কাজ করতে সক্ষম না হও; তাহলে ক্ষুদার্ত কে খাদ্য দান করো এবং পিপাসিতকে পানি পান করাও। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ কর। আর যদি তোমার দ্বারা এই কাজ করাও সম্ভব না হয়; তবে কল্যাণকর কথা ব্যতীত অন্য কথা থেকে তোমার জিহ্বাকে সংযত রাখো। (মুসনাদে আহমাদ : ১৮৬৭০)

উল্লেখিত হাদিসে ইসলাম দাশ মুক্তি কে জান্নাত লাভের বিশেষ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর দাসমুক্তির জন্য যেহেতু প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়, সেহেতু আল্লাহ তা’আলা ইসলামী অর্থনীতির প্রধান উৎস জাকাত বন্টনের খাত সমূহের মধ্যে দাসমুক্তি কে উল্লেখ করেছেন।

৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি : ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে তার ঋণ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে যাকাত প্রদান করা যাবে।

হাদিসে এসেছে, কাবিসা ইবনু মাখারেক (রা:) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন, একবার আমি কিছু ঋণের জিম্মাদার হয়েছিলাম। অতএব এ ব্যাপারে কিছু চাওয়ার জন্য আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, মদিনায় অবস্থান করো, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার নিকট যাকাতের মাল না আসে। তখন আমি তা হতে তোমাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দান করব। অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেন, মনে রেখ হে কাবিসা! তিন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারো জন্য যাকাতের মাল হতে সাহায্য চাওয়া হালাল নয়। (১). যে ব্যক্তি কোন ঋণের জিম্মাদার হয়েছে তার জন্য (যাকাতের মাল হতে) সাহায্য চাওয়া হালাল; যতক্ষণ না সে তা পরিশোধ করে। তারপর তা বন্ধ করে দিবে।

(২). যে ব্যক্তি কোন বালা-মুসিবতে আক্রান্ত হয়েছে; যাতে তার সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেছে। তার জন্য (যাকাতের মাল হতে) সাহায্য চাওয়া হালাল। যতক্ষণ না তার প্রয়োজন পূর্ণ করার মতো অথবা তিনি বলেছেন বেঁচে থাকার মতো কোনো কিছু লাভ করবে। (৩). যে ব্যক্তি অভাবগ্রস্ত হয়েছে এমনকি তার প্রতিবেশীদের মধ্যে জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন তিনজন ব্যক্তি তার দারিদ্র্যের ব্যাপারে সাক্ষী প্রদান করেছেন; তার জন্য (যাকাতের মাল থেকে) সাহায্য চাওয়া হালাল। যতক্ষণ না সে তার জীবিকা নির্বাহের মত অথবা তিনি বলেছেন বেঁচে থাকার মত কিছু লাভ করে। হে কাবিসা! এরা ব্যতীত যারা (যাকাতের মাল থেকে) চায় তারা হারাম খাচ্ছে। (মুসলিম : ১০৪৪)

৭. আল্লাহর রাস্তায় : আল্লাহর দিনকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টা “ফি সাবিলিল্লাহ” বা আল্লাহর রাস্তায় অন্তর্ভুক্ত। জিহাদ, দ্বীনি ইলম অর্জনের যাবতীয় পথ এবং দ্বীন প্রচারের যাবতীয় মাধ্যম এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে এসেছে- আতা ইবনু ইয়াসার রাদিয়াল্লাহ হতে বর্ণিত; রাসূল (সাঃ) বলেছেন, সম্পদশালী ব্যক্তির জন্য যাকাত গ্রহণ হালাল নয়। তবে পাঁচ শ্রেণীর ধনীর জন্য তা জায়েয। (১). আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত ব্যক্তি। (২). যাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী। (৩). ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি (৪). যে ব্যক্তি যাকাতের মাল নিজ মাল দ্বারা ক্রয় করেছে। (৫). মিসকিন প্রতিবেশী তার প্রাপ্ত যাকাত থেকে ধনী ব্যক্তিকে উপঢৌকন দিয়েছেন। (আবু দাঊদ : ১৬৩৫)

৮. মুসাফির : সফরে গিয়ে যার পাথেয় শেষ হয়ে গেছে সে ব্যক্তিকে যাকাতের অর্থ প্রদান করে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে যাকাতের অর্থ দান করা যাবে। এক্ষেত্রে উক্ত মুসাফির সম্পদশালী হলেও তাকে যাকাত প্রদান করা যাবে।

আরো পড়ুন :

যাদের উপর যাকাত ফরজ তার বিস্তারিত

রোজার ফরজ কয়টি ও কি কি ?

রোজা ভঙ্গের কারণ সমূহ

রমজানের রোজা কত হিজরীতে ফরজ হয়েছে ?

নামাজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *